হিন্দুদের তেত্রিশ কোটি দেব-দেবীদের মধ্যে ভগবান গণেশ আগে পূজিত হন কেন? (Why lord Ganesha is worshiped first ?)

‘ওম শ্রী গণেশায় নমহ’
একদন্তং মহাকায়ং লম্বোদর গজাননম।
বিঘ্নবিনাশকং দেবং হেরম্বং পনমাম্যহম।।
ওঁ সর্ববিঘ্ন বিনাশয় সর্বকল্যাণ হেতবে।
পার্বতী প্রিয় পুত্রায় গণেশায় নমো নমঃ।।

সামনেই তো গণেশ পূজা, অবাঙালিদের সাথে সাথেই এখন বহু বাঙালি পরিবারে সমারোহের সাথে পূজিত হন গণপতি। বলা চলে গণেশ আরাধনার মধ্য দিয়েই অন্যান্য পুজোর শুভারম্ভ হয়। কিন্তু কেন ভেবে দেখেছেন? বেশীরভাগ মানুষই মনে করেন, অনেক দেবতাই আছেন তবে, গণেশের পুজো সবার আগে হয় কেন? সত্যি তো হিন্দুদের তেত্রিশ কোটি দেব-দেবীর মধ্যে কেন বলুন তো সবার আগে পূজা পাওয়ার অধিকারী হয়েছে সিদ্ধিদাতা? চলুন আজ আলোকপাত করা যাক সেই ইতিহাসে-

শাস্ত্র কি বলছে-

ওম শ্রী গণেশায় নমহ

শাস্ত্রে শিব ও পার্বতীর পুত্র গণেশকেই প্রথম উপাসক হিসাবে বিবেচনা করা হয়। গণধিপতি হওয়ার দরুণই তাঁর আর এক নাম গণপতি। জ্যোতিষশাস্ত্রে, তিনি কেতুর দেবতা। ফলে বিশ্ব সংসারের কর্তা হওয়ার দরুণ তিনি যে কোনো সমস্যার সমাধান করে থাকেন। হাতির মতো মাথা থাকার কারণে তার আর এক নাম গজানন। তবে আপনি কি জানেন? হিন্দু শাস্ত্র মতে যে কোনো কাজের জন্য প্রথমে কেন গণেশকেই পুজো করা হয়!

শুভ কাজের প্রারম্ভে পূজিত হন তিনি –

আপনারা অবশ্যই লক্ষ্য করেছেন যেকোনো শুভ কাজ শুরু করার আগে গণেশকে স্মরণ করেন সকলে। শুধুতাই নয় যে-কোনো কিছু উদ্বোধনের সময় অনেকেই প্রবেশ দ্বারের সামনে শ্রী গণেশায় নমঃ লিখে থাকেন। আর তারই সাথে প্রথম পূজিত হন, গণেশ। বেশীরভাগ লোকেরাই এই রীতি জানেন না। তবে চলুন শুনেনি কেন, সমস্ত দেবতার আগে গণেশ পুজো করা হয়৷

আপনার ভিতরে লুকিয়ে থাকা সুপ্ত পৃথিবীটিকে আবিষ্কার করুন প্রাণিক হিলার অরিজিতার সাথে – https://spark.live/consult/online-consultation-on-pranic-healing-tarot-numerology-bangla-arijita-bhattacharya/

বাধা-বিঘ্ন দূর করেন তিনি-

আসলে, কোনো পুজো, উপাসনা, আচার ও কোনো কাজের ক্ষেত্রে যাতে কোনো বাধা না আসে তার জন্য তার জন্য প্রথমেই গণেশ পুজো হয়ে থাকে। তবে এর পেছনে একটি পৌরাণিক কারণ রয়েছে। কথিত আছে, এক সময় সমস্ত দেবতাদের মধ্যে কে শ্রেষ্ঠ তা নিয়ে বিরোধ দেখা দিয়েছিলো। বিশ্বে সমস্ত দেবতারদের আগে কার পুজো হবে তা নিয়ে বিবাদ মেটাতেই নারদ সবাইকে নিয়ে মহাদেবের দারস্থ হলেন। আর এরই মধ্য শ্রেষ্ঠত্বর পরিচয় নিয়ে আবারও শুরু হলো বিবাদ। আর এর দরুণই মহাদেব শিব একটি প্রতিযোগীতার আয়োজন করেন। সমস্ত দেবতাকে তাদের নিজ নিজ বাহনে চেপে পৃথিবীর চারপাশে প্রদক্ষিণ করতে বলা হয়।

উপস্থিত বুদ্ধিতে পারদর্শী-

এই শুনে সকল দেবতারা নিজ নিজ বাহনে চড়ে ত্রিলোক পরিক্রমা করতে চলে গেলেন। কিন্তু ভারী শরীরের গণেশ নিজ বাহন মুষিক-সহ রয়ে গেলেন অনেক পিছনে। কিন্তু তিনি সাহস হারালেন না। তিনি ওখান থেকে মাতা-পিতা যেখানে ছিলেন সেখানে গেলেন। পিতা-মাতাকে সাতবার পরিক্রমা করে ফিরে এলেন। এরপরই সমস্ত দেবতারা নিজ নিজ বাহন নিয়ে প্রদক্ষিণ করে ফিরে এলেন। ভগবান শিব গণেশকেই বিজয়ী ঘোষণা করলেন। সমস্ত দেবতারা এই সিদ্ধান্ত শুনে অবাক হয়ে গেলেন এবং মহাদেবকে জিজ্ঞাসা করলেন, এর কারণ কি? তখন মহাদেব বলেন, এই বিশ্ব সংসারে পিতামাতার স্থানই সর্বোচ্চ। যা দেবতাদের এবং সমস্ত সৃষ্টি থেকেও উচ্চতর বলে বিবেচিত। এরপরই মহাদেবের এই কথা শুনে সমস্ত দেবতারাই এর একমত হন। আর সেই থেকেই মত্যলোকে গণেশেরই প্রথম পুজো হয়। তার বুদ্ধিমত্তার জন্যেই আদিকাল থেকেই সমস্ত দেবতাদের আগে গণেশেরই পুজো করা হয়।

আরেকটি কাহিনী-

এই প্রসঙ্গে শিব-পুরাণে আরেকটি কাহিনীর উল্লেখ পাওয়া যায়। শিব-পুরান মতে, মাতা পার্বতী নিজের কক্ষে প্রবেশ করার পূর্বে পুত্র গণেশকে পাহাড় দেওয়ার জন্য বলে যান, সেই অবস্থায় আচমকা ভগবান শিব চলে আসেন, এবং তিনি পার্বতীর সাথে দেখা করতে চাইলে, গণেশের দ্বারা বাধাপ্রাপ্ত হন। তখন দেবাদিদেব জানতেন না গণেশ তার পুত্র। তাই তার স্পর্ধাতে ক্রোধিত হয়ে, তিনি গণেশের মুন্ডুচ্ছেদ করেন, যেটি জানা মাত্রই দেবী পার্বতী ক্রোধিত হয়ে পড়েন এবং তিনি সর্ব-সাকুল্য ধ্বংস করে দেওয়ার হুমকি দেন। তখন হাতির মাথা গণেশের দেহে স্থাপন করেন মহাদেব, আর যেহুতু দেবী পার্বতীর ক্রোধের হাত থেকে সমগ্র বিশ্ব ধ্বংস হওয়ার থেকে রক্ষা পায়, তাই দেবাদিদেব পুত্র গণেশকে বাধা-বিঘ্ন মোচনকারী রূপে সকলের আগে পূজা হওয়ার আশীর্বাদ দেন। তখন থেকেই সকল দেব-দেবীর আগে পূজিত হন সিদ্ধিদাতা বিনায়ক।

একদন্তং মহাকায়ং লম্বোদর গজাননম।
বিঘ্নবিনাশকং দেবং হেরম্বং পনমাম্যহম।।
ওঁ সর্ববিঘ্ন বিনাশয় সর্বকল্যাণ হেতবে।
পার্বতী প্রিয় পুত্রায় গণেশায় নমো নমঃ।।

এইবার বুঝলেন, কেন এই নাদুস-নুদুস লাড্ডু প্রিয় দেবতাকে সকলের প্রথমে পূজা করা হয়, তার মধ্যে বিরাজ করে বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ বুদ্ধিমত্তা, তাই তাকে বিশেষভাবে পূজা করা হয় বুধবার। আপনার বাড়িতেও নিশ্চয়ই আবির্ভাব ঘটবে সিদ্ধিদাতার এই বছরে, শ্রদ্ধার সাথে, আনন্দ করে তাকে বাড়িতে নিয়ে আসুন, আর নিজের সংসারে সৌভাগ্য নিয়ে আসুন।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।