মানসিক স্বাস্থ্যের গুরুত্ব : আলোচনায় রয়েছেন ড. শ্রীতমা মিত্র ঘোষ(The importance of mental health: In discussion with Sritama Mitra Ghosh)

মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে আমরা অনেকেই খুব উদাসীন, অনেকেই মনে করেন মনকে কন্ট্রোল করা খুব সহজ কিন্তু একটু ভেবে দেখবেনতো- মন ভালো না থাকলে আপনি কোনো ক্ষেত্রেই সফলতা পেতে সক্ষম হতে পারবেন না। কয়েকটি খুব গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের বিশদে উত্তর দিয়েছেন বিশিষ্ট সার্টিফায়েড সাইক্রিয়াটিক কাউন্সিলর এবং সার্টিফায়েড অ্যাডভান্স ক্যারিয়ার কাউন্সিলর ড. শ্রীতমা মিত্র ঘোষ। আসুন একটু দেখে নেওয়া যাক।

১) কোভিড পরিস্থিতিতে দীর্ঘদিন গৃহবন্দী থেকে মনের নানান অস্থিরতা বৃদ্ধি পাচ্ছে, কি করণীয়?

উত্তর- ‘কোভিড ১৯’ এই শব্দটি প্রতিটি মুহূর্তে আমাদের জীবনে অস্থিরতা তৈরী করে যাচ্ছে। একাকিত্ব, মানসিক অবসাদ, মেজাজগত অস্থিরতা, অর্থনৈতিক দিক থেকে ব্যর্থতা,অহেতুক ভয়,বিষন্নতা,আশঙ্কা এইসকল মানসিক সমস্যায়গুলি ছোট থেকে বড় সকলকেই ভীষণভাবে গ্রাস করছে। তার সাথে ঘুম না হওয়া, তামাকজাত দ্রব্যের অতিরিক্ত সেবন এই সবই মানবজাতির প্রকৃত ও সুন্দর জীবনকে বিভিন্ন সমস্যামূলক দিকে নিয়ে যাচ্ছে। এই কঠিন সময়ে গৃহবন্দী অবস্থাতেই নিজের এবং পরিবারের সকলের যত্ন নিতে হবে-এটি খুবই আবশ্যক। এই যত্ন শুধু আপনার নিজের ক্ষেত্রেই ফলপ্রসূ নয়, এই পরিস্থিতিতে লড়াই করার ক্ষমতাও আপনাকে প্রদান করবে।

প্রথমত- নির্দিষ্ট সময়ে এবং নির্দিষ্ট পরিমানে খাবার খাওয়া প্রয়োজন। খাবারগুলি অতি অবশ্যই পুষ্টিকর হবে অর্থাৎ প্রোটিন,শর্করা,মিনারেল,ভিটামিন এইসকল উপাদানগুলি যেন খাদ্যতালিকায় থাকে। এগুলি আমাদের রোগ প্রতিরোধক ক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহায়তা করবে।

দ্বিতীয়ত- খুব বেশি পরিমানে চিনি খাওয়া উচিত নয় এবং এলকোহল জাতীয় দ্রব্য থেকে সরে থাকা শ্রেয়।

তৃতীয়ত- তামাক সেবন থেকে বিরত থাকতে হবে, যদি করোনা দ্বারা আপনি সংক্রামিত হন, তাহলে তামাক সেবনের ফলে কোরোনার ক্ষতিকর দিকগুলি আরও বেশি প্রকট হবে।

চতুর্থত- মেডিটেশন বা ধ্যান করা অত্যন্ত জরুরি। নিদ্রা বা একাগ্রতা বৃদ্ধি করতে নিয়মিত অল্পবিস্তর মেডিটেশন করা আবশ্যক।

পঞ্চমত- নিজের সাথে কথা বলা(Self Talking) ব্যক্তিত্ব বিকাশের ক্ষেত্রে যেমন প্রয়োজনীয়, তেমনি মানসিক সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে সাহায্যকারী।

ষষ্ঠত- নিজেকে বিশ্লেষণ(Self Analysis) করা। সমস্যার গুরুত্ব,মাত্রা,আচরণ- কতটা প্রয়োজনীয় ও প্রাসঙ্গিক নিজেকে প্রশ্ন করুন অনেক সময় উত্তর থাকে মুখের গোড়ায়। শুধু সময়মতো সেটিকে বুজতে হবে।
এগুলি ছাড়াও যদি প্রয়োজন হয় মনোবিদের সাহায্য নিতে পারেন। জীবনকে সুন্দর করে তোলার জন্য আপনার সাইবোধটার কথা মাথায় রেখে মনোবিদ চেষ্টা করবেন আপনাকে সঠিক পথের দিশা প্রদান করতে।

২) শিশুদের বিশেষত এই সময় নানা রকম সাইকোলজিক্যাল সমস্যা দেখা দিচ্ছে, এর থেকে রেহাই পাওয়ার কিছু উপায় যদি বলেন?

উত্তর- বোর্ডের তুলনায় শিশুদের এনার্জি লেভেল অনেকটাই বেশি, কিন্তু এই অবস্থাতে তাদের এই অতিরিক্ত এনার্জি বহিঃপ্রকাশের কোনো জায়গা নেই। বাড়িতে বসে অনলাইন ক্লাস আর পৱিবাৱেৱ সদস্যদের সাথে সময় কাটানো এই দুইয়ের মধ্যে থাকতে থাকতে তাদের মধ্যে একঘেয়ে তৈরী হচ্ছে। মোবাইল ফোনের প্রতি আসক্তি যেন বেড়েই চলেছে, অতিরিক্ত ও অহেতুক ভয়,জেদি এই সকল মানসিক সমস্যা দেখা দিচ্ছে।

১) খুব সচেতন ভাবে বিনোদনের জন্য স্মার্টফোনের ব্যবহার করুন। সারাদিনের মধ্যে একটি নির্দিষ্ট সময় রাখুন(Screening Time), যখুন শিশুকে স্মার্টফোনে ক্ষতিগ্রস্ত নয় এমন কোনো বিনোদনের সাথে পরিচিত করান।

২)বাড়িরই শিশুর সঙ্গে পর্যাপ্ত পরিমানে সময় অতিবাহিত করুন।

৩) খেলার সময় শিশুদের সাথে তাদের মতো করে মিশুন।

৪) বাড়ির ছোট ছোট কাজে শিশুদের নিয়োগ করুন- ফল গোছানো, সবজি চিনতে পৰ, নির্দেশ অনুযায় জায়গার জিনিস জায়গায় রাখা ইত্যাদি।

৫) কোনো পছন্দের জিনিস পেতে গেলে ভালো কোনো কাজ আগে করতে হবে, এই ধারণাটি শিশুদের সেখান যেকোনো কাজের মধ্যে দিয়ে। ভালোলাগার জিনিস তখনই পাবে যখুন ভালো কোনও কাজ করবে।

৬) শুধু ঘুমের সময় নয়, অন্যান্য অবসর সময়েও শিশুকে গল্প পড়ে শোনান।

৭) পুরোনো ছবির অ্যালবাম দেখিয়ে সবার সাথে পরিচয় করান।

৮) বাবা মায়েরা তাদের সন্তানদের একটি রুটিনের মধ্যে রাখার চেষ্টা করবেন।

৯) বর্তমান কঠিন পরিস্থিতি সম্পর্কে শিশুদের সুন্দরভাবে বুঝিয়ে বলতে হবে।

১০) খেলার মাধ্যমে পড়া অত্যন্ত জরুরি, বিভিন্ন ধরণের রংবেরঙের ওয়ার্কশিটের মাধ্যম শিশুদের মধ্যে পড়াশুনোর প্রতি আগ্রহ জন্মাবে।

১১) পর্যাপ্ত ও নির্দিষ্ট পরিমান খেলার সময় দিতে হবে।

১২) মিউজিক থেরাপি শিশু মনে ভালো প্রভাব বিস্তার করে।

আরও পড়ুন-মনোবিদ শ্রীমন্তী গুহর সঙ্গে মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে কথোপকথন (Conversation about mental health with psychologist Srimanti Guha)

৩) কাউন্সিলিং কিভাবে মানুষের মানসিক স্বাস্থ্য সুন্দর করতে পারে?

উত্তর- অনেক সময় সঠিক পথ আমরা বেছে নিতে পারিনা, উচিত অনুচিতের মধ্যে দ্বিধাগ্রস্থ হয়ে পড়ি। নিজের ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও আমরা ভয় পাই। কাউন্সিলিং পদ্ধতির মাধ্যমে কাউন্সিলর মানুষকে অনেকটা উপায় বা পন্থা বলে দেন, যেগুলি অনুসরণ করলে মানসিক স্বাস্থ্য কঠিন থাকে।

নিজের ভালো গুনগুলিকে পর্যালোচনা করা। কি কি গুণ আছে, যার দ্বারা মানুষ নিজে এবং অপরকে ভালো লাগাতে পারবে- সেটির সন্ধান পেতে হবে। ব্যক্তিগত শক্তি প্রত্যেকটি মানুষেরই আছে, কিন্তু সন্ধান পাওয়া যাচ্ছেনা। “আমি হেরে গেছি”, “এই চাকরিটা আমার দ্বারা হলোনা”-এই ভাবে না বলে “চাকরির জন্য ইন্টারভিউটা দিতে পারলাম, পরে আরও ভালো করে চেষ্টা করবো”- এইভাবেই মানসিক স্থিতাবস্তাকে পরিবর্তন করতে হবে।

যাদের প্রতি আপনি কৃতজ্ঞ, যারা আপনার উপকার করেছেন- সম্মানার্থে তাঁদের উদ্দেশ্যে কিছু লেখার অভ্যেস করুন। মানসিক অনুভূতি ও আবেগ বহিঃপ্রকাশের এটি খুব ভালো এক পন্থা।

একটি সময়ে একটি নির্দিষ্ট বিষয়ের প্রতি ফোকাস তৈরী করুন। নিজের মন বসানোর চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। প্রাত্যহিক রুটিনের সাথে শরীরচর্চা ও নিজের জন্যে সময় নির্ধারণ করা অত্যন্ত জরুরি।

এমন কোনো মানুষকে বেছে নিন যার কাছে নিজের মনের কথা খুলে বলতে পারেন। শুধুমাত্র দুঃখের কথা নয় আনন্দও ভাগ করে নিতে পারবেন। এই বন্ডিং আপনার মধ্যে সামাজিক ও আবেগকে উন্নততরো করবে।

অন্যের জন্যে কিছু করার চেষ্টা করুন- যা আপনাকে সন্তুষ্টি প্রদান করবে। বিরতি কিন্তু নেওয়া খুবই জরুরি।

এই সমস্ত পথ আমাদের জানা থাকলেও অনেকসময় আমরা অবলম্বন করতে পারিনা। কাউন্সিলিং এই পথগুলিকে সামনে ধরতে সাহায্য করবে।

৪) কখন আমরা বুজবো যে আমাদের একজন কাউন্সিলরের কাছে যাওয়া প্রয়োজন?

উত্তর- যেকোনো মানসিক সমস্যা যখুন নিজের দ্বারা অর্থাৎ নিজেকে বিশ্লেষণ করে বুঝিয়ে তার কারণ কি অথবা কিকরে এসব থেকে বিরত থাকা যায় – এই সমস্ত কিছু কিছু সম্ভবপর হয়না, তখন একজন প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কাউন্সিলরের প্রয়োজন হয়, যিনি আপনাকে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে আপনার পাশে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেবেন।
একাকিত্ব,রাগ,আশাহীনতা, দুঃখ যখন গ্রাস করে তখন দরকার হয় এমন একজন মানুষের যিনি তার অভিজ্ঞতার দ্বারা সঠিক পথের সন্ধান দেবেন। তামাক সেবন, এলকোহল,যৌন লালসা যখন অতিরিক্ত হয়ে যায়, তখন সেগুলিকে নিয়ন্ত্রণের জন্য কাউন্সিলিংয়ের প্রয়োজন। এইধরণের নানান কারণ আছে যখুন আপনাকে একজন কাউন্সিলরের পরামর্শ নিয়ে চলা উচিত।

৫) আপনার তরফ থেকে কিছু বিশেষ বার্তা যদি দেন আমাদের পাঠকদের জন্যে?

উত্তর- সমস্ত অভিভাবক, কেয়ার গেভার, স্কুল টিচার্স এবং প্রিন্সিপাল এবং ম্যানেজমেন্ট আধিকারিক অর্থাৎ যারা কিছু গুরুতর দায়িত্বে আছেন এবং যাদের মাধ্যমে অসংখ্য নানান বয়সী মানুষ তাদের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে এগিয়ে যাচ্ছে-এইসব ব্যক্তিদের প্রতি আমার একটাই বার্তা- আমরা জীবনে অনেক ভুল করেছি বিভিন্ন দিকে,সেই থেকে আবার শিক্ষাও পেয়েছি। তাই যখন আমাদের চারপাশে কেউ ভুল করে, তখন তাকে ভালো করে বুঝিয়ে বলুন, নাহলে তার মধ্যে এক অদ্ভুত ভয় চলে আসবে। নিজেদের ছোটবেলার কথা মনে করে আমাদের সন্তানদের ছোটদের মতো করেই কাটাতে দিতে হবে। স্কুলগুলি অতিরিক্ত প্রেসার দেবেন না যাতে, অভিভাবকরাও চাপ সৃষ্টি করে ফেলেন। যেকোনো মানসিক সমস্যার জন্য কাউন্সিলিংকে পজিটিভ ভাবে নিন। নিজেদের স্টিগমাকে দূর করুন এবং সকলের মধ্যে অমানষিক সচেতনতা ছড়িয়ে দিন এবং তার দিকে লক্ষ্য রাখুন।

Spark.Live এর বিশিষ্ট সার্টিফায়েড সাইক্রিয়াটিক কাউন্সিলর এবং সার্টিফায়েড অ্যাডভান্স ক্যারিয়ার কাউন্সিলর ড. শ্রীতমা মিত্র ঘোষের সঙ্গে অনলাইন কন্সালটেশনের জন্যে লিংকটিতে ক্লিক করুন-https://spark.live/consult/mental-health-consultation-with-dr-sritama-mitra-ghosh-bangla

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।