কালচার রেসের দৌড়ে কি ক্রমেই হারিয়ে যাচ্ছে বাংলা ভাষা ? (Is the culture race defeating the Bengali language ?)

  • by

বাংলা ভাষা- একজন বাঙালি হিসেবে আমি সত্যি নিজের ভাষার ওপর গর্ব অনুভব করি। কারণ এই ভাষাটাই আমাকে আমার মনের ব্যাপ্তিগুলি ফুটিয়ে তুলতে, সুন্দরভাবে পরিবেশন করতে শিখিয়েছে। একটা ভাষা আসলে নিছক একটা সামান্য ভাষা হয় না। তা তৈরী করে ভালোবাসার ভাষা, রাগ- অভিমানের ভাষা, অহংকারের ভাষা। তাই যে কোন ভাষারই নিজস্ব গুরুত্ব অপরিসীম। কিন্তু কালচার কম্পিটিশনের মধ্যে কি নিজেদের মাতৃভাষাটিকে আমরা পিছনে ঠেলে দিচ্ছি?

আমি কেন আমার মতো অনেক বাঙালিই কিন্তু মনে করছেন, একই কথা। কালচার কম্পিটিশনের দৌড় আর শোঅফের সৌজন্যের মোড়কে বেঁধে আমরা বাংলা ভাষায় অনবরত কথা বলাটিকে জাস্ট খুব ব্যাকডেটেডের তকমা দিয়ে ফেলেছি। বাঙালি হয়ে বাংলায় থেকে বাংলায় কথা বলতে না পাড়ার মধ্যে যেমন আমরা কোনো লজ্জা বা ভুল খুঁজে পাই না একই ভাবে বাংলা কথার উচ্চারণের মধ্যে নিছক সেটিকে অন্যদের কাছে আকর্ষিত করে তোলার জন্য, ইংরেজি বা হিন্দি টান নিয়ে আসাকে আমরা স্মার্টনেস ভাবি। হায়রে বাঙালি!

লজ্জা –

যে ভাষাতে রবি ঠাকুর নিজের অবিস্মরণীয় সৃষ্টি গুলি তুলে ধরতে, শরৎচন্দ্র নিজের আকর্ষণীয় চরিত্রগুলি এমনকি নবীন যুগের অনুপম রায় থেকে শুরু করে রূপম ইসলাম নিজের গান বাঁধতে লজ্জা পান না, এমনকি আমরা শুনতে বা পড়তেও লজ্জা পাই না, কিন্তু কারো সামনে অনর্গল নির্ভেজাল বাংলা ভাষা বলতে লজ্জা পাই, ভয় হতে থাকে, সামনের মানুষটি আবার এইটা ভেবে বসছেন না তো যে আমি ইংরেজি একেবারেই পারি না! মাঝে মধ্যে তো নিজের পরিচিত মানুষগুলির নামও হিন্দি উচারণে ডাকাটাই ইংরেজি ভাষায় – “কুল / cool “মনে করি। কি তাই তো?

সূত্রপাত –

কিন্তু ভেবে দেখেছেন এর সূত্রপাত কোথায়? মনে আছে ছোটবেলায় মা দিদিমণিরা ঘাড় ধরে ভালো করে বর্ণপরিচয় পড়াতেন, যাতে বাংলা লিখতে গিয়ে হোঁচট না খাই। কিন্তু এখন ক্রমেই বাংলা ভাষা খুদে পড়ুয়াদের কাছে সেকেন্ড ল্যাংগুয়েজ হয়ে যাচ্ছে। কোনোমতে সাব্জেক্টটায় পাশ করলেই চলে। তাই সাব্জেক্টটার প্রতি না আসে ভালোবাসা, নাই দক্ষতা। আবার কম্পিটিশনের যুগে তো অনেক অভিভাবক মনে করেন, বাংলা ভাষা না শিখলেও চলবে, বরং নিজের ক্যারিয়ার গঠনের ক্ষেত্রে বেশি প্রাধান্য দেওয়া উচিৎ হিন্দিকে বা অন্য কোনো ভাষাকে। ব্যাস এইভাবেই বাংলা থেকে যাচ্ছে নাগালের বাইরে।

এমনকি আমাদের সাথে নয় ভাষাভাষীর মানুষের দেখা হলে, আমরা কিন্তু তাদের ভাষায় কথা বলে বোঝাতে সক্ষম হচ্ছি, যে আমাদের ওই ভাষায় দক্ষতা কতটা আছে। কিন্তু এটা লক্ষ্য করেছেন, সেই ফাঁকে যে আপনি নিজের ভাষার মানুষের সাথেও হিন্দি বা ইরাজিতে কথা বলাটাই শ্রেয় মনে করে ফেলছেন? বা বলা চলে অভ্যেসে পরিণত করে ফেলেছেন? কিন্তু অন্য ভাষার মানুষটি কিন্তু নিজের ভাষার বাইরে বেরিয়ে কথা বলছেন না, এটাই কিন্তু লক্ষ্য করার বিষয়।

সন্মান প্রদান-

আমরা শুধু বাংলা ভাষাকে গায়ে মাখি, ভাষা দিবসের দিন, ২৫ শে বৈশাখ আর বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসব দুর্গাপূজার কটা দিন, তাও বলবো বিশেষ করে অষ্টমীর দিন, দশমীর দিন সিঁদুর খেলা ও বসন্ত উৎসব। এই দিনগুলিতে, হাবে ভাবে, পোশাক আশাকে, খাদ্যাভ্যাসে এমনকি নিজের কথা বলার ভাষাতেও, আমাদের বাঙালি হতে লজ্জা লাগে না। আর বাকি দিনগুলির হিসেবে তো দেওয়াই রইলো।

তাই বলছি, আমাদের মাতৃভাষা, আমাদের সম্পদ। এটিকে কিভাবে আরো সুদূর প্রসারী করা যায়, এর সন্মান কিভাবে বাড়ানো যায়, সবটাই কিন্তু আমাদের হাতে। না বলছি না, একেবারে সবসময় বাংলাতে কথা বলুন, বরং বলছি, প্রয়োজনে অন্য ভাষায় বলুন, কিন্তু নিজের ভাষায় কথা বলতে লজ্জা না পেয়ে, তাকে দিন ফার্স্ট প্রিয়োরিটি।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।