বিয়ের পিঁড়িতে বসতেও বাঁধ সাধছে চীনা ভাইরাস (Impact of corona virus on weddings)

করোনার চোখরাঙানিতে এখন আমাদের কর্মক্ষেত্র, বিনোদন কেন্দ্র, এমনকি আমোদ প্রমোদ এর ক্ষেত্রও হয়ে উঠেছে আমাদের বাড়িটি, যেখানে, উইকেন্ড এর অলস দিন গুলি আর কাজ থেকে ফিরে, তাড়াতাড়ি খাওয়াদাওয়া সেরে আবার পরের দিনের প্রতস্তুতির মধ্যে বাড়িতে হাতে গোনা সময় কাটানো হলেও, মনটা বার বার সময় পেলেই বাইরে ঘুরতে চাইতো. এখন তো আর উপায় নেই, নিত্যদিনের রুটিনটাই একেবারে পাল্টে গেছে. সকালে ঘুম থেকে ওঠা, হ্যা তারা নেই যে ফারুষ হয়ে স্নান করে কাজে বেরোতে হবে, তাও ওই আধাঘন্টা পরে উঠে সাময়িক ফ্রেশ হয়ে নিয়ে ব্যাস ল্যাপটপ খুলে বাড়িতেই বসতে হচ্ছে কাজে.

খাটের ওপর আরাম করে হোক বা রিডিং টেবিলে, আবার তার মাঝে মধ্যেই রান্নাঘরের যুদ্ধটাই সামাল দিতে হচ্ছে, ১০ মিনিটের ব্রেক নিয়েই খুন্তি নাড়াতে হচ্ছে কিচেনে. এইভাবেই বেলা গড়িয়ে যাচ্ছে ব্যাস তারপর স্নান খাওয়া করে আবার কাজে বসা. কিন্তু এই স্নান খাওয়ার পরের সময়টা ঘরের খাটে বসে কাজ করাটা যেন চাইলেও সেই গতি আনতে পারে না, যেটার পরিকল্পনা নিয়ে আমরা দিনের শুরুতে কাজ শুরু করি.

যাই হোক একইভাবে চলছে আমার দিনলিপি. এর মধ্যে ওই সন্ধ্যের সময় বন্ধু বান্ধব, পুরোনো পরিচিত, পাড়ার কাকিমা, পাতানো বোন সবার ফোন আস্তে শুরু করেছে এখন. আসলে বাড়িতে বসে বসে সবাই এখন এতটাই বড় হয়ে যাচ্ছে, মুঠোফোনের সাহায্যই এখন সকলেরই সারভাইভ করার একমাত্র বাহন. কাল সন্ধ্যেতে সেইরকমই একটি ফোন পাই এক বহুআগের পরিচিত বান্ধবীর থেকে. এখন যোগাযোগ বলতে ওই মাজে সাঝে ফেসবুকের ম্যাসেঞ্জের নইলে হোয়াটস্যাপ এর স্টেটাস.

তো যাই হোক, আমার হাতে তখন কাজ ছিল না কিছু, তো ঠিক করলাম, একটু কথা বলাই যাক. কোথায় কোথায় জিজ্ঞেস করে ফেললাম, বিয়ে করছিস কবে?- যে প্রশ্নটি আমাদের মতো কম বয়েসীরা মানে এক কথায়, বাঙালি মাত্রই করে. আর ফোনের ওপাশের ব্যক্তিটিও যেন একেবারে প্রস্তুত ছিল এই উত্তরের.

  • ‘আর বলিস না. সাতকাণ্ডের পর বাড়িতে মানলাম বিয়ের বিষয়টা. দুই বাড়ি রাজিও হলো. পাকা কথা , বাড়ি বুকিং এমনকি কার্ড ডিস্ট্রিবিউশন সবটাই কমপ্লিট. এই বৈশাকেই বিয়ের ডেট. কিন্তু এই করোনার জন্য সব মাটি. বিয়ে তো পিছোলোই, সাথে এর পরের ডেটও ঠিক করতে পারছি না. কারণ কবে সব স্বাভাবিক হবে, কিছু জানিনা না.’

খারাপ লাগলো- সত্যিতো চৈত্র পেরোলেই তো বৈশাখ আবার বিয়ের দিতে ঠাঁসা. অনেকেরই নিশ্চই আমার এই বান্ধবীটির মতোই পরিস্থিতি. বিয়ের সব কিছু ঠিক হয়ে, এখন ভেস্তে যাচ্ছে. একটা প্রিপারেশন তো আছেই, সাথে কাড়ি কাড়ি টাকা দিয়ে বিয়ের বাজার, বাড়ি বুকিং, ডেকোরেটার্সদের পেইমেন্ট সবটাই তো হয়ে গেছে. এখন এই টাকাগুলি তো আর ফিরে পাওয়া যাবে না. এমনকি পরের দিতে ওই বিয়ে বাড়িটি ফাঁকা থাকবে নাকি সেটাও কে জানে. মানে এই মুহূর্তের পিছিয়ে যাওয়া সব বিয়ের অনুষ্ঠানের ভবিষ্যৎ বিশ বাওঁ জলে.

এই মুহূর্তে বিয়ের কথা ভাবলে- অনেকটা চিত্রটা হবে যে বড় বৌ দুজনের মুখেই মাস্ক, আর হাতে গ্লাভস. পুরোহিত ও সোশ্যাল ডিস্টেনসিং নিয়ম নিধি মেনে বেশ কিছুটা দূর থেকে বিয়ের মন্ত্র উচ্চারণ করছেন. কন্যাদানের প্রথা না হয় একটু স্কিপ করে ভালো. আর নিমন্ত্রিত ব্যক্তিদের সংখ্যা ওই ২০ জন মতো, তাও কুই গায়ে গায়ে চেয়ারে বসে হাসি ঠাট্টা কবে না, এক হাত দূরে দূরে মাস্ক গ্লাভস পরেই বিয়ের অনুষ্ঠানে যদি দিতে হবে. আর খাবারের মধ্যে প্রাধান্য পাবে শুধুমাত্র প্রোটিনযুক্ত ইমিউনিটি বেসড খাবার.—–থাকে আর ভাবতে পারছি না. এইভাবে বিয়ে হওয়াটা সত্যিই চাপের.

কারণ ধরুন সব নর্মাল হতে সময় নিলো অগাস্ট মাস. এইবার আগে থেকেই অগাস্ট মাসের জন্য বিয়ে বাড়িগুলি বুক হয়ে রইলে, তারা নিশ্চই সেই বিয়ে ক্যানসেল করে আপনাকে আগে বাড়ি বুক করতে দেবেনা, যতই এডভান্স নেওয়া থাকুক. এমনকি টাকা ফিরিয়ে দেবে নাকি তাও- অনিশ্চিত. ভাবা যায় ! একটা মহামারী শুধু মানুষ মারছে না, মানব সভ্যতাকে ধ্বংস করার অঙ্গীকার করে নি, বরং ভবিষ্যৎ পুরো মাত্রায় অনিশ্চিত করতে উঠে পরে লেগেছে.

আরেকটি কথাও মনে আসছে- চৈত্র মাসের জন্য অনেকেরই পাকা কথা মানে বিয়ের ডেট ফাইনাল হয়নি, তারাও কিন্তু পিছোচ্ছে, এমনকি পিছোবে. অন্তত মিড্ এপ্রিল বা জুন অবধি পাকা কথার তো কোনো চান্সই নেই অনেকের. কারণ সকলের অর্থনৈতিক অবস্থা কোন পাড়ে গিয়ে ঠেকে, সেটা এখন সকলের আতঙ্ক, সাথে তো করোনার কোপ রয়েইছে. তাই এই মুহূর্তে সব কিছুর মতো বিয়ের ভবিষ্যতেও শনির দশাই চলছে বলা যেতে পারে. সব কিছু মিলিয়ে একটা বাড়তি চাপ শুরু হয়েছে. কোথায় যে এর শেষ সেটাই আসলে অজানা.

তবে আমি বলবো, বেশি চিন্তা করেও তো লাভ নেই. কারণ বিয়ের সিদ্ধান্তে অনড় থাকলে, সামাজিক অনুষ্ঠান নাই বা হলো. পরে সুযোগ বুঝে, মহা সমারোহে বিয়ের অনুষ্ঠান করে নেবেন. এতে বিয়ে বাড়ির টাকাটাও মার্ যাবে না.

এই মুহূর্তে সকলেই কিন্তু যুদ্ধকালীন পরিস্থিতির মতো দেশকে এই মহামারীর থেকে বাঁচাতে বদ্ধপরিকর. করোনা সৈনিকরা (ডাক্তার, নার্স, পুলিশ, মিলিটারি, প্রশাসন, মিডিয়া, সাফাইকর্মী) ভারতকে করণামুক্ত করবে -এটা আমার নিশ্চিত. সময় লাগবে, তাও জানি. কিন্তু এই মুহূর্তে যেটি সবচাইতে বেশি দরকার সেটি হলো আমাদের এইভাবেই বাড়িতে থাকা. কারণ যত বাড়িতে থেকে সোশ্যাল ডিস্টেনসিং মেনে চলবো ততই পরিস্থিতিকে স্বাভাবিক আনতে পারব.

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।