২১ দিনের লক ডাউনে সারভাইভ করার খাবার মজুত আছে তো আপনার বাড়িতে? (Families are trying to stock commodities for survival during the lockdown phase)

সময়টা ওই পৌনে নয়টা হবে. দেশের প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ সবে শেষ হলো. ভাষণ চলাকালীন কেউ অন্য চ্যানেলে শিফটও করতে পারেন নি. কারণ ততক্ষনে করোনা মোকাবিলার সতর্কতার জেরে নরেন্দ্র মোদির নিষেধাজ্ঞা, বিধিনিষেধ মুহূর্তের মধ্যে সকলের আগামী দুই মাসের ঘুম কেড়ে নিয়েছে. প্রথম সাময়িক লক ডাউনের আওতা শেষ হয়নি তখনও, আর তার মধ্যেই আগামী ২১ দিনের সম্পূর্ণ লক ডাউনের ঘোষণা রীতিমতো আরেক নতুন আতঙ্কের সৃষ্টি করেছে মানুষের মধ্যে.

এতো দিন তা না হয় ছিল নিজেকে আর নিজের মানুষদের এই মহামারীর থেকে বাঁচিয়ে রাখার সতর্কতা. এখন শুরু হলো অন্তত খাদ্যপণ্যের অকাল পড়ার আগে নিজেদের যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার জন্য, নিজেদেরকে বাঁচানোর স্বার্থে খাদ্য মজুত রাখার এক ভয়ঙ্কর চিন্তা. ২১ দিন নিজেদেরকে বাড়িতে বন্ধ করে রাখবো, তা তো না হয় শক্ত হলেও মানতে পারব. কিন্তু না খেয়ে অনাহারে কাটাবো কি করে, ভাবলেই তখন কপালের ভাঁজ আরো স্পষ্ট হচ্ছে. বুকের ভিতরটাও কেমন একটা দুরু দুরু শুরু হয়ে গিয়েছে ততক্ষনে. একটা দম আটকে যাওয়ার মতন পরিস্থিতি. কিন্তু বুঝলাম এই পরিস্থিতিতে ভয় পেলে, বাকি দিনগুলো কোনোমতে সারভাইভ করতে পারবো না.

আমার থেকেও বাজে অবস্থা তখন আমার মায়ের. বয়স ৫১ এর মহিলা তখন আরো ভীত, ভাবছে-একেই মাসের শেষ, হাতে গোনা কয়েকটা টাকা, পেনশনের টাকা পেতেও এখন কিছুটা দিন দেরি, আমি বা ভাইয়ের থেকে পাওয়া সংসারের খরচও প্রায় শেষের মুখে, এই মুহূর্তে দুই থেকে আড়াই মাশরৎ খাবার মজুত করার জন্য রাতারাতি টাকাটাও পাবো কোথায়? সেই তো তার জন্য যেতে হবে হয় এটিএম নয়তো ব্যাংক.

কিন্তু এই কিছু আগেই শুনলাম, বাইরে বেরোলেই পুলিশ লাঠিচার্জ করছে. পাড়ার বিল্টুর চায়ের দোকানে কিছু মানুষ জমায়েত হয়ে চায়ের আড্ডা বসিয়েছিলো তাই বিল্টু সহ এক ক্রেতাকে পুলিশ নিয়ে গেছে. তো সে ভয়ে বাড়ির বাইরে পা রাখাটাও এই মুহূর্তে মুশকিল. আবার মাসকাবাড়ির জিনিসের ফর্দ তিন দিন আগেই পাড়ার মুদির দোকানে দিয়ে এসেছে, কিন্তু সেও আজ পাঠাচ্ছি, কাল পাঠাচ্ছি বলে দেরি করছে. অগত্যা পরে ফোন করে জানা গেল, সেই মুদি মালিকও ভয় পাচ্ছে, কারণ তার স্টক করা মালে ইতিমধ্যে অকাল পড়া শুরু হয়ে গিয়েছে. তাই মাসকাবাড়ির এত গুলো জিনিস সে একেবারে পাঠাতে পারছে না. এটা শোনার পর থেকেই মায়ের প্রেসার বাড়ার মতো পরিস্থিতি.

মায়ের ভয় দেখে আমার ভয় যেন আরো দ্বিগুন বাড়লো. না আর বাড়িতে থাকতে পারলাম না. সোজা মাসকাবাড়ির ব্যাগ তা হাতে ঝুলিয়ে, মুখে নাক মাস্ক দিয়ে ঢেকে, (গ্লাভস থাকলে তাও পড়তাম, কিন্তু কোথাও খুঁজে পাই নি), ফোন, টাকার ব্যাগ নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম, সাথে সাহায্যের জন্য নিয়ে গেলাম ভাই কে. সেও একেবারে মাস্ক পরেই বেরিয়েছে. মা কাচিয়ে কুচিয়ে কিছু টাকা বের করে দিলো, আর আমার কাছে যা আছে সেটাই সম্বল. অন্তত আর কিছু না হোক, চাল, ডাল, চিনি, তেল আর ডিম্ পেলেও অনাহারে কাটবে না জীবন.

বাইরে গিয়ে দেখি সবই কার্যত বন্ধ. একবার পুলিশের লাঠির বাড়িতেই সবাই বাড়ি মুখী হয়েছে. খোলা বলতে মুদি দোকান, ওষুধের দোকান. প্রথমেই ভাবলাম মাসকাবাড়ির জিনিস যে দোকান থেকে বাকিতে নি সেই দোকানে না গিয়ে অন্য দোকানে যাই, একেবারে নগদেই না হয় এখন কিনে নেবো. ভাবলাম কোনো ছোট দোকানে যাই, সেখানে তো ভিড় কম হবে, জিনিস দিতে পারবে. কিন্তু এই পরিস্থিতিতে সেই ছোট দোকানের সামনে বেশি ভিড় জমায়, দোকান মালিক নিজের ব্যবহারে একটা আলাদা র্যাবের ফর্ম যোগ করেছেন. রীতিমতো ক্রেতাদের ডোমকাতে দেখলাম. না ওই দোকানের সামনে আর এক মুহূর্তও না দাঁড়িয়ে, চলে গেলাম পরিচিত মুদির দোকানে.

কিছু আগেই পুলিশের সাময়িক লাঠি চার্জের ফল স্বরূপ কেউই এখন দোকানের সামনে হুমড়ি খেয়ে পড়ছে না. বরং একটা মিনিমাম দূরত্ব ম্যান্টেইন করে দোকানের সামনে দাঁড়াচ্ছে.

আমার সামনে তখন আরো পাঁচজন. সকলের মধ্যেই কেমন – do or die পরিস্থিতি. করণের থেকেও যেন বেশি ভয় এখন নিজের ভবিষ্যতের. কিন্তু নিজেদের লিস্ট করা জিনিস কেউই পুরোটা পাচ্ছেন না. এই আমার পিছনের মানুষটি তার বৌকে ফোনে বলছে, আরো কি কি লাগবে এখুনি বোলো, সব কিন্তু পাওয়া যাচ্ছে না, এরপরে আর পাওয়ায় যাবে না. এখন মোতায়েন না করতে পারলে, খুব অসুবিধা হবে. এটাও শুনলাম, তিনি বলছেন বাড়িতে টো তা ডিম্ তো আছে আরো ১০ তা নিয়ে নি, তাহলে অনেকটা সেভ হবে. কথাটা শোনার পর আমার মাথায় ঘুরছে- দোকান যখন খোলা পেয়েছি চাল ডাল বাদেও আর কি কি কেনা যেতে পারে, এই যেন তখন গুপ্তধন লুঠ করার মতো পালা. দুইমাসের জন্য নিজের ভবিষ্যৎকে আর একটু সেভ করা.

যাই হোক, আমি যখন লাইন পেরিয়ে পৌঁছাতে পারলাম, তখন মুদি কাকুকে বললাম, মা যে ফর্দ পাঠিয়েছে, সেটা কি দিতে পারবে? উনি তো মাথা নাড়লেন. এর পর চাল ডাল সহ মাথায় সেই মুহূর্তে যা যা এলো সবটাই বলতে থাকলাম মুদি কাকুকে. আর উনিও দিলেন. কিন্তু সবটাই অল্প. বললো মহাজনদের কাছে পৌঁছাতে পারছি না জিনিস আনতে, আর এই মুহূর্তে পুরো পেইমেন্ট ছাড়া কেউ জিনিস দিতেও রাজি না. ব্যবসা করবো কি করে, কতদিনই বা আর করতে পারবো জানিনা, সব স্টক শেষ হচ্ছে. তাই ৫- ১০ কিলোর বেশি চাল দেওয়া সম্ভব না. যাই হোক, যা পেলাম তা নিয়ে বাড়ি ফিরতে পারলাম তিন ঘন্টা পরে.

যাদের নিউক্লিয়ার ফ্যামিলি তাদের তো ঠিক আছে, কিন্তু যাদের বড় সংসার, তাদের তাহলে এই মুহূর্তে কি করা উচিত. প্রতিদিনের তুলনায় কি কম খেতে হবে? করণের সামাল দিতে গিয়ে দুর্ভিক্ষের সৃষ্টি হবে না তো পরিবারে পরিবারে? আপনার কি মনে হয় কমেন্টে জানান.

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।