বাঙালি কি এখনও মনে রেখেছে রবিঠাকুরকে?(Do Bengalis still remember Rabindranth Tagore?)

বাঙালির প্রিয় রবিঠাকুরকে নিয়ে বাঙালির উন্মাদনা কখনোই কমে নি, আশা করি কমবেও না। তবে বাঙালির রবিঠাকুরের প্রতি আসল ভালোবাসা স্পষ্ট ভাবে লক্ষ্য করা যায়, দুটি দিনে, এক – ২৫শে বৈশাখ তার জন্মদিবসে আর দ্বিতীয়টি হল- ২২শে শ্রাবন, তার প্রয়াণ দিবসে। বাকি বছরটা রবীন্দ্রনাথের গানের সাথে নানারকম এক্সপেরিমেন্ট চললেও এই দুটি দিন নিয়ে বাঙালি এখনও একটু হলেও ইমোশনাল। বাকি সময়গুলি পাশ্চাত্য কালচারে নিজেকে সাজাতে-গোছাতে ‘কুল’ মনে হলেও, এই দুটি দিনে, বাঙালিদের বাঙালিয়ানা পূজাও চলে পুরোদমে। না আরেকটি দিনও কিন্তু আছে, যেইদিন কিছুটা হলেও আমাদের ভাবনায় জায়গা করে নেন রবিঠাকুর। বসন্ত উৎসব, কিন্তু দিনটিকে আমি লিপিবদ্ধ করি নি কারণ, পরিবেশকে রঙিন করে তোলার জন্য কিছুটা যদিও রবীন্দ্রনাথের আসল গানগুলির ব্যবহার হয়, কিন্তু সিংহভাগটাতেই রবীন্দ্রসংগীতের ওপর নানারকম মিউজিকের খেলা প্রয়োগ করা এক্সপেরিমেন্টাল বা বলা চলে রিমেক গানগুলির প্রচলন বেশি। তাই দিনটি নির্ভেজাল রূপে রবিঠাকুরের নাম উৎসর্গীকৃত নয় একেবারেই।

না না, আমি কিন্তু কাউকেই কোনোভাবে কটাক্ষ করছি না। কারণ সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে প্রতিটি বাঙালিরই নিজের কালচারের ছন্দে কিছু পরিবর্তন এসেছে। আমরা সকলেই ঠিকঠাক সাজিয়ে নিয়েছি, এক-একটি দিনের এক-একরকম পারপাস। আমিও তার থেকে একেবারেই বাদ পড়ি না। আমি শুধু এখনকার বাস্তব চিত্রটির মূল্যায়ন করতে চলেছি। আপামর বাঙালির জীবনে রবীন্দ্রনাথ এখনও কতটা আবেগ জুড়ে রয়েছে, সেটি শুধুমাত্র বলতে চাইছি। চলুন তাহলে খুঁজে বের করা যাক, আমরা কখন কখন রবি ঠাকুরকে মনে করি?

১. গান শোনানোর কেউ আবদার করলে –

বাঙালি যতই আধুনিকতার চাদরে নিজেকে আবৃত করে নিক না কেন, এখনও বহুক্ষেত্রেই বাঙালি মেয়েকে গান শোনানোর কথা বললে, প্রথমেই কিন্তু তার ভাবনায় রবীন্দ্রসংগীত জায়গা করে নেয়। বন্ধুদের মধ্যে হলে সেটা আলাদা বিষয়, তখন তো যেমন তেমন গান আমাদের কণ্ঠে ভেসে ওঠে, কিন্তু যদি বয়োজ্যেষ্ঠ কেউ এক কলি গান শোনাতে বলেন, আমরা কিন্তু রবিঠাকুরকে গুরুত্ব না দিয়ে পারি না। বিশেষ করে যদি পাত্র পক্ষের তরফ থেকে হবু পাত্রীর দিকে এই বায়না যায়, তাহলে তো কোনো কোথায় নেই, রবিঠাকুরের গান হয়ে ওঠে আমাদের একমাত্র নিজের ভালো সংস্কৃতির পরিচয় দেওয়ার উপায়।

পঞ্চাশ বছরের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন সঙ্গীত শিক্ষিকার কাছে শিখুন ১৩ প্রকারের গান, দেবযানী মজুমদার – https://spark.live/consult/learn-13-musical-forms-with-experienced-singer-debjani-mazumdar-bangla/

২. কোনো সাংস্কৃতিক মঞ্চে গানের উপস্থাপনা –

বাঙালি মানেই সারা বছরের বিশেষ দিনগুলির সাথে কিছু সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের তালবন্ধন করা। যে কোন ছুটতেই বাঙালি গানের নাচের অনুষ্ঠান করতে প্রথম সারিতে থাকে। আর বড় কালচারাল অনুষ্ঠানের মঞ্চে উদ্বোধনী সংগীত কিন্তু এখনও বহু জায়গায় রীতি মনে রবীন্দ্রসংগীতই করা হয়ে থাকে।

৩. গানের আড্ডা –

আবার যারা রবীন্দ্রসংগীতের তালিম নিচ্ছেন, তাদের কাছে এই অনুষ্ঠানগুলিতে রবীন্দ্রসংগীত গাওয়া তো খুবই স্বাভাবিক বিষয়, কিন্তু অনেক সময় বন্ধু-বান্ধবীদের সাথে আড্ডায় কিন্তু উঠে আসে এই রচনাগুলি। মেসের বন্ধুদের সাথে কাজ থেকে ফেরার পরে আড্ডা হোক বা উইকেন্ডস এর ছুটি শুরু হওয়ার আগের রাত হোক, সকলে একত্রিত হয়ে বসে, মোটামোটি বাড়ির আরামদায়ক পোশাকে গিটার হাতে অনেকের গলাতেই শোনা যায় মনমুগ্ধ করা রবীন্দ্রসৃষ্ট কিছু গানের কলি। যেমন হতেই পারে- আমার হিয়ার মাঝে লুকিয়ে আছে বা আমি চিনি গো চিনি তোমারে। কেউ গানের লয় বজায় রাখার জন্য প্লাস্টিকের বোতলে তাল দিচ্ছে বা কেউ শুধুমাত্র হাতের তালিতেই সেই ছন্দের হিসাব রাখছে। বেশ এক অপূর্ব মুহূর্তের সৃষ্টি করে এই গান গুলি।

অভিজ্ঞ সুরকার, গিটার বাদক এবং কমার্শিয়াল সংগীত শিল্পী সূর্য্যজ্যোতির অনলাইন ক্লাস নিতে ক্লিক করুন – https://spark.live/consult/learn-to-play-guitar-and-sing-commercial-songs-with-suryajyoti-banerjee-bengali/

৪. বৃষ্টি-মুখর দিনে –

এই অভিজ্ঞতাটা সম্পূর্ণ ভাবে ব্যক্তিগত। দিনের বেলা যখন চারিদিক অন্ধকার ঘনিয়ে এসে বজ্র-বিদ্যুতের সাথে অমোঘ ধারায় বৃষ্টি পরে, আর আমি বাড়ির জানলায় বসে দুচোখ ভোরে শুধু ঝরে পড়া বৃষ্টিতে গাছ-পালা, বাড়ির ছাদ, চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকা পোলগুলিকে স্নান করতে দেখি, বৃষ্টির ফলে তৈরী হওয়া হালকা ঠান্ডা আবহাওয়ার মেজাজে নিজেকে মানিয়ে তুলি, তখন আমার গলায় নিজে থেকেই ভেসে ওঠে -প্রাণের প্রিয় রবিঠাকুরের গান- আজি ঝড়ো ঝড়ো মুখর বাদর দিনে। সাথে যদিও জায়গা করে নেয় বৃষ্টি-বিষয়ক গানগুলি। জানিনা, কার কার এই একই রকম মুহূর্তে রবিঠাকুরের গান মনে পরে, তবে বৃষ্টিবাদল দিনে আমার আবেগতাড়িত মনকে একমাত্র রবিঠাকুরের গানই শান্ত করতে পারে।

৫. ঘুরতে গেলে-

এই ক্ষেত্রে বলতে পারি, ভ্রমণ যদি হয়, বাংলার ঐতিহ্যপূর্ণ স্থানে, একমাত্র তখনি আমার মতো বহু বাঙালির চয়েস লিস্টে থাকে রবীন্দ্রসংগীত। ভ্রমণ গন্তব্য যদি হয় ঝাড়গ্রাম, পুরুলিয়া বা রবিঠাকুরের নিজের স্থান বোলপুর তাহলে আর কোনো গান কি পুরো বিষয়টির সাথে তাল মেলাতে পারে? লালমাটির সাথে -গ্রামছাড়া ওই রাঙামাটির পথ যেন আঙ্গিক ভাবে জড়িত। এই ভ্রমণ গন্তব্যে পৌঁছানোর আগেও, গাড়িতে বা ট্রেনে এই গানগুলি কিন্তু চালিয়ে আমরা প্রকৃতির সাথে আরো নিজেকে ধাতস্থ করে তোলার প্রয়াস করতে থাকি, যাতে গন্তব্যে পৌঁছে প্রকৃতির সকল সৈন্দর্য্যকে মন দিয়ে উপভোগ করতে পারি

তাহলে বুঝতে হয়তো অসুবিধা নেই, রবি ঠাকুরকে মনে করার আমাদের ধরণ বদলেছে, ফ্রিকোয়েন্সি বদলেছে, কিন্তু তিনি ম্লান হয়ে যান নি। তিনি আমাদের জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে সুন্দর করে তোলার এক ধ্রুব সত্য। সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে আধুনিক ছন্দেই আমাদের মধ্যে বেঁচে আছেন রবি ঠাকুর, আর তার সাথেই গুরুত্ব পাচ্ছে তার সকল সৃষ্টি। যেভাবেই থাকুক, যেমন ভাবেই থাকুক, আমাদের মধ্যে বেঁচে থাকুক এই বিখ্যাত সৃষ্টকর্তা।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।