জানেন কি বাঙালি ডায়েটিশিয়ান শর্মিষ্ঠা রায় দত্ত এই প্রজন্মের কাছে এক দৃষ্টান্ত(Did you know that Bengali dietitian Sharmistha Roy Dutta is an example to this generation)

  • by

বর্তমানে মেয়েরা কোনো অংশেই যে পিছিয়ে নেই তা আমরা সকলেই জানি, কিন্তু আজ এক অন্য গল্প নিয়ে হাজির হলাম আপনাদের সামনে। কারণ এমন এক নারীর কথা বলবো যে বহু পুরুষকেও পিছনে ফেলে এগিয়ে চলেছেন। অনেকের ধারণা মা হওয়ার পর মেয়েদের বুদ্ধির ধার অনেক কমে যায়, কিন্তু শর্মিষ্ঠা রায় দত্তকে বলা যেতে পারে সদ্য মা হওয়া এক নারী কিন্তু যাবতীয় দায়িত্ব কর্তব্য করেও নিজের কর্মক্ষেত্রে তিনি সবার সেরার শিরোপা অর্জণ করে নিয়েছেন একমাত্র নিজের চেষ্টায়।

শর্মিষ্ঠার ছেলেবেলা-

স্কুলের ছাত্রী শর্মিষ্ঠা

ছোটোবেলা থেকে একান্নবর্তী পরিবারে বড়ো হওয়া এবং বাড়ির সব থেকে ছোট মেয়ে শর্মিষ্ঠা,তাই তার উপর আদরের মাত্রা ছিল সকলের থেকে অনেকাংশেই বেশি। ছোটবেলায় যদিও তার ইচ্ছে ছিলো নেভিতে যুক্ত হওয়ার কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে ক্লাস ৮ এ চশমা চোখে চলে আসার কারণে, ছেলেবেলার এই স্বপ্ন থেকে তাঁকে পিছিয়ে যেতে হয়। কিন্তু তাবলে তিনি একেবারেই হার মানেননি, মাধ্যমিকে খুব ভালো ফল করার পর বিজ্ঞান নিয়ে পড়াশুনো করেছেন, শর্মিষ্ঠার বাবা একজন স্বনামধন্য ডাক্তার, সর্বদা তিনি ছিলেন শর্মিষ্ঠার পাশে এবং তিনিই গাইড করেছিলেন ডায়েটিশিয়ান হিসেবে শর্মিষ্ঠাকে প্রতিষ্টিত হওয়ার জন্যে।


সেই ছোটবেলা থেকেই স্কুলের ছুটি পেলেই বাবার সঙ্গে চলে যেতেন তার ক্লিনিকে এবং মন দিয়ে সবটা ফলো করতেন, এভাবেই দিনের পর দিন তার নিজেকে একজন ডায়েটিশিয়ান হিসেবে গড়ে তোলার ইচ্ছে বৃদ্ধি পেতে থাকে। সেই সূত্রেই ২০১১ সালে ফুড এন্ড নিউট্রিশনে বিএসসি করা, ঠিক তখন থেকেই শর্মিষ্ঠা তার প্র্যাক্টিস শুরু করে দিয়েছিলেন, কলেজে তিনি অনেক কিছুই শিখেছিলেন ঠিকই কিন্তু কর্মক্ষেত্রে পদার্পনের জন্য প্রয়োজন হয় একজন সঠিক অভিভাবকের, তাই ঠিক তখন থেকেই তিনি তার বাবার সঙ্গে হাতে কলমে কাজ শুরু করেন। প্রতি পদে একজন শিক্ষকের মতো করে তাকে পরিচালনা করে গেছেন তার বাবা।

কর্মজীবনের শুরু-

প্রিয় দুই শিক্ষিকার সঙ্গে মধ্যমণি শর্মিষ্ঠা

২০১৩ তে শর্মিষ্ঠা এমএসসি কমপ্লিট করেন এবং এই মাস্টার ডিগ্রি করতে করতে পাশাপাশি বাবার সঙ্গে প্র্যাক্টিসও চালিয়ে গিয়েছিলেন। মাস্টার ডিগ্রি করার সময় ফোর্থ সেমিস্টারের সময়েই তিনি জীবনের প্রথম চাকরির সুযোগ পান এক স্বনামধন্য ব্র্যান্ড(Naukri.com) থেকে। আসলে শর্মিষ্ঠা পরিবারে তার সব দাদা দিদিদের ছোট থেকেই দেখেছেন চাকরি করতে এবং সকলেই নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছেন নিজের চেষ্টায়, তাই শর্মিষ্ঠার ছেলেবেলা থেকেই এক অদ্ভুত তাগিদ ছিল যত তাড়াতাড়ি সম্ভব হোক তাকেও নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে অর্থাৎ চাকরি করে নিজের মা বাবার মুখ উজ্জ্বল করতে হবে। তাই এমএসসি চলাকালীন তিনি সেই চেষ্টা শুরু করে দিয়েছিলেন এবং ফলস্বরূপ যা হলো তা সত্যি অবিশ্বাস্য।
৩টি ইন্টারভিউ হল তার ফোনের মাধ্যমেই, সামনে কিন্তু তার ফাইনাল পরীক্ষা। থিওরি পরীক্ষা হওয়ার পরেই তিনি জীবনের প্রথম চাকরি জয়েন করলেন একরাশ উত্তেজনা এক আকাশ স্বপ্ন চোখে ১৬ই আগস্ট ২০১৩, এই দিনটি চিরস্মরণীয় তার কাছে।


তার মাস্টার্স চলা কালীন তিনিই প্রথম ছিলেন যিনি চাকরি পান এবং প্রাকটিক্যাল পরীক্ষার আগেই তাকে জয়েন করে নিতে হয়। কারণ সেই ছোটবেলা থেকে লড়াই, সেই ছোটবেলা থেকেই নিজের পায়ে দাঁড়ানোর জেদ তাকে সকলের আগে নিয়ে এসেছে। তারপর ছুটি নিয়ে তিনি প্রাকটিক্যাল পরীক্ষাগুলি দিয়ে মাস্টার্স সম্পূর্ণ করেন খুবই সাফল্যতার সঙ্গে।


তারপর থেকেই সবটা যেন স্বপ্নের জলছবির মতো একটার পর একটা চাকরির অফার, একটার পর একটা পদোন্নতি। বিভিন্ন কোম্পানিতে নিউট্রিশনিস্ট হিসেবে কাজ করা শুরু করেন, বিভিন্ন হসপিটালে একজন সুদক্ষ ডায়েটিশিয়ান হিসেবে কাজ করেন। ছোট থেকেই তার নিজেকে দাঁড় করানোর তাগিদ তাকে নিজের কর্মক্ষেত্রে একটার পর একটা ধাপ এগিয়ে যেতে সাহায্য করছিলো, স্কুল জীবন থেকেই পড়াশুনো ছিল তার প্রিয় বন্ধু, আনন্দ মজা সবই করেছেন কিন্তু পড়াশুনো ছিল তার মূল অস্ত্র, কখনোই নিজের লক্ষ্য থেকে পিছিয়ে যাননি বা একাগ্রতা নষ্ট হতে দেননি।

জীবনের নতুন অধ্যায়

প্রতিষ্ঠিত কনসালট্যান্ট ডায়েটিশিয়ান শর্মিষ্ঠা

২০১৬ তে চাকরিসূত্রে তিনি ছিলেন ভুবনেশ্বরে, বাবা গিয়ে সব গুছিয়ে দিয়ে আসেন কিন্তু একা থেকে চাকরি করে লড়াইটা শর্মিষ্ঠাকে একাই করতে হয়েছে। ঠিক এই সময়েই শর্মিষ্ঠার মা তার বিয়ের প্রস্তাব দেন, মেয়ে দীর্ঘদিন ধরেই স্বতন্ত্রভাবে চাকরি করছে তাই এটাই নিশ্চই সঠিক সময় উনি ভেবেছিলেন, আসলে মায়ের ভূমিকাও তার জীবনে অসীম। আমরা হয়তো সকলেই জানি মায়েরা নিশ্চুপে আমাদের জন্য কত কি করে যায় তার ফল হয়তো ভবিষ্যতে আমরা বুজতে পারি।

শর্মিষ্ঠা বরাবরই নিজের পড়াশুনোর যাবতীয় সাহায্য পেয়েছেন তার মায়ের কাছে, মায়ের কাছে পড়া না দিলে কিছুতেই যেন শর্মিষ্ঠার পড়া তৈরী হতোনা। আসলে এটাইতো নির্ভরতার জায়গা। শর্মিষ্ঠা বরাবরই বাধ্য মেয়ে,তাই রাজি হয়ে গেলেন মায়ের প্রস্তাবে। খবরের কাগজে বিজ্ঞাপন দিয়েই সব কিছু ঠিক হয়ে গেলো। এক নতুন অধ্যায়ের শুরু হতে চললো শর্মিষ্ঠার জীবনে।

১০ দিনের বেশি ছুটি দেবেনা তাই তাকে চাকরিটা ছাড়তে হয়, কিন্তু ওই যে মনের তাগিদ থাকলে জীবনে কোনো বাধাই প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে দাঁড়াতে পারেনা, তাই অদ্ভুত ভাবে ঠিক বৌভাতের পরের দিনই হটাৎ করেই একটা ফোন আসে, ‘Abbortt’ থেকে কটক এ পোস্টিং, সারাজীবন মনে রাখার মতোই একটা অনুভূতি। বিয়ের ১২ দিনের মাথায় তিনি কটকে চাকরি তে জয়েন করে নিলেন এবং অবশ্যই তার জীবনসঙ্গীর সম্পূর্ণ সাপোর্ট ছিল এবং আজও আছে তাই শর্মিষ্ঠা হয়তো নিজের পায়ের তলার মাটি শক্ত করতে পেরেছে আরো সহজে।

জীবনের সেরা পাওয়া মা হওয়া

ছেলের সঙ্গে খেলার ছলে শর্মিষ্ঠা

২০১৯-এ মা হওয়ার সুখবর পান তিনি, তখন তিনি চাকরি করছেন কিন্তু হটাৎ করে যেন এক কালো মেঘের অন্ধকার ঘনিয়ে এল শর্মিষ্ঠার জীবনে যা সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত ছিল, কমপ্লিকেটেড প্রেগন্যান্সি এবং সম্পূর্ণ বেড রেস্ট হয়ে গেলো তার। একজন ক্যারিয়ারিস্টিক মেয়ের জন্য এর থেকে কঠিন বোধ হয় আর কিছু হয়না যে তাকে তাকে তার কর্মজীবন থেকে সম্পূর্ণ সরে আসতে হবে। কিন্তু ঐযে মা হওয়া কি আর মুখের কথা, সন্তানের সুস্থতার খাতিরে নিজের স্বপ্নের দিকে সেইমুহূর্তে একবারও তাকাননি শর্মিষ্ঠা। শুধুমাত্র একটি সুস্থ সন্তান জন্ম দেওয়ার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করে গেছেন।


নানারকম মানসিক অস্থিরতা তৈরী হয়, কোনো একটা দিন তিনি নিজের পড়াশুনো বা কাজ ছেড়ে থাকেন নি, আর এমন এক পরিস্থিতি তৈরী হল যে সব কিছু থেকে অনেক দূরত্ব তৈরী হয়ে গেলো তার, এক মানসিক লড়াই তৈরী হল এবং এক না দেখতে পাওয়া যুদ্ধ মনের মধ্যে তাতেও যে তাকে জিততেই হবে, কারণ শর্মিষ্ঠার রয়েছে অদম্য মনের জোর

সত্যিই তিনি দশভুজা


তাই নিজের মনেই মোটিভেশন শুরু হলো এবং অনলাইন কন্সালটেশন করতে শুরু করলেন। ইতিমধ্যেই সুস্থ সুন্দর সন্তানের জন্ম দেন শর্মিষ্ঠা এবং সন্তানের ৩ মাস হওয়ার পরেই আবার নারায়ানা হসপিটালের সঙ্গে যুক্ত হন এবং বর্তমানে ডক্টরস রেড্ডির সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন।

আরও পড়ুন-সঠিক নিউট্রিশন হল সুস্বাস্থ্যের একমাত্র পথ ( Proper nutrition is the only way to be healthy )

বর্তমানে Spark.Live এর অন্যতম সদস্য

বর্তমানে শর্মিষ্ঠা রয়েছেন আমাদের সঙ্গে অর্থাৎ Spark.Live এর এক অন্যতম প্রিয় এক্সপার্ট, তিনি তার এত বছরের অভিজ্ঞতাকে কেন্ত্র করে অপূর্ব সুন্দরভাবে অনলাইন কন্সালটেশন করে চলেছেন। শতাধিক ক্লাইন্টকে তিনি তার ডায়েট চার্টের মাধ্যমে সুস্থতার দিশা দেখিয়ে চলেছেন। Spark.Live এর যেকোনো অনুষ্ঠানে তিনি অংশগ্রহণ করেন এবং তার দুর্দান্ত প্রতিভা সকল দর্শকের সামনে তুলে ধরেন। সম্প্রতি Spark.Live এ অনুষ্ঠিত হয়েছিল ‘The Great Indian Nutrition Festival‘, শর্মিষ্ঠা এক অপূর্ব লাইভ করে দুর্দান্ত ফিডব্যাক পেয়েছিলেন, তিনি সঠিক এবং বেঠিক রান্নার বাসনপত্র নিয়ে লাইভটি করেছিলেন, বহু মানুষ উপকৃত হয়েছেন কারণ তারা হয়তো জানতেন না কি ভুল করে ফেলছিলেন রান্নার বাসনের ব্যবহারের।


আমরা খুবই কৃতজ্ঞ তার কাছে, তিনি এভাবে সুন্দর করে অনলাইন ডায়েট কন্সালটেশন করে চলেছেন Spark.Live এ, যার দ্বারা বহু মানুষেরা নিজেদের বাড়িতে বসেই খুবই কম খরচে নিজেদের ডায়েটের সমস্তরকম সমস্যার সমাধান করে নিতে পারছেন।
শুনলে হয়তো অবাক হবেন তবে একথা না বললেই নয় যে- মাসে প্রায় ৩০০-৩৫০ টি বুকিং থাকে শর্মিষ্ঠার এবং Spark.Live এর পক্ষ থেকে আমরাও ওনাকে নানাভাবে পুরস্কৃত করার চেষ্টা করি এবং ওনার ক্লাইন্টদের যথাসম্ভব সুযোগ সুবিধে সরবরাহ করার চেষ্টা করি।

শর্মিষ্ঠার মতে-“সব মেয়েদের নিজের পায়ের তলার জমি শক্ত করা প্রয়োজন,যাতে তাঁরাও সমাজের সকল স্তরের মানুষের পাশে থাকতে পারেন এবং সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে পারেন”,আশা করি আগামী দিনে শর্মিষ্ঠা জীবনে আরও এগিয়ে যাবেন এবং একজন স্বতন্ত্র নারী হয়ে দৃষ্টান্ত তৈরী করে যাবেন সমাজের সকল মানুষের জন্যে।

Spark.Live এ কনসালট্যান্ট ডায়েটিশিয়ান শর্মিষ্ঠা রায় দত্তর সঙ্গে অনলাইন কন্সালটেশনের জন্যে লিংকটিতে ক্লিক করুন-https://spark.live/consult/dietician-sharmishtha-roy-dutta-advice-on-various-nutrition-mantras

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।