অরিজিৎ দে: এক ব্যতিক্রমী ডায়েটিশিয়ান হয়ে ওঠার গল্প(Arijit Dey: The story of becoming an exceptional dietitian)

ডায়েটেটিক্স হল এমন একটি কার্যক্ষেত্র যেখানে ডায়েটেশিয়ান হিসেবে নারীর সংখ্যাই বেশি, পুরুষদের ক্ষেত্রে কোনো এক অজ্ঞাত কারণে এটি এখনও অফস্ক্রিন অপশন হয়েই রয়ে গেছে। কিন্তু আর সকল বিষয়ের মতো এটির ক্ষেত্রেও ব্যতিক্রম আছে,তারই পথিকৃৎ হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন এবং নিজের কর্মক্ষেত্রকে এক অন্য মাত্রা দিয়েছেন স্বনামধন্য ডায়েটিশিয়ান অরিজিৎ দে।

ছেলেবেলা থেকেই লড়াকু অরিজিৎ দে

ছোটবেলা থেকেই লড়াকু মনোভাবাপন্ন ও ফুটবলপ্রেমী মোহনবাগানী বাবাকে চোখের সামনে রেখে, মায়ের আদর মাখানো শাসনে, ভাইকে পিতৃতুল্য কর্তব্যে বড় করে তোলেন অরিজিৎ দে, নিজেও ছিলেন অত্যন্ত মনোযোগী শিক্ষার্থী। আজন্ম উত্তরপাড়া নিবাসী অরিজিৎ ছোটবেলা থেকেই একজন খেলোয়াড় হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন, তুখোড় ফুটবল খেলতেন, ছিলেন ভলিবল চ্যাম্পিয়ন। হুগলি ডিস্ট্রিক্টে ফার্স্ট ডিভিশন ভলিবলে ইউসিসি ক্লাবের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন তিনি, কিন্তু ভাগ্যকর্তার ইচ্ছে ছিল অন্যরকম।

খেলোয়াড় হওয়ার স্বপ্নপূরণ হলোনা

খেলার মাঠে অরিজিৎ

একটু বড় হতেই হাই পাওয়ারের চশমা চলে আসে চোখে, জীবনের মতো প্লেয়ার হওয়ার স্বপ্ন হারাতে হলো তাকে। কিন্তু অদম্য ইচ্ছেশক্তি তাকে এগিয়ে নিয়ে গেলো জীবনের পথে, নিজে না খেললেও সুযোগ পেলেই বাবা ও ভাইয়ের সঙ্গে মাঠে চলে যেতেন খেলা দেখতে। খেলার মাঠ থেকে নিজেকে সরিয়ে ফেলতে গিয়ে তিনি একটি শিক্ষা পেয়েছিলেন। তিনি তখন থেকেই বদ্ধ পরিকর হলেন যে জীবনে কর্মক্ষেত্র তৈরির জন্য কোনো একটিমাত্র বিষয় নিয়ে তিনি পড়বেন না,তাই উচ্চ মাধ্যমিক বিজ্ঞান নিয়ে পাশ করে তিনি জুলজি নিয়ে গ্রাডুয়েশন করেন। এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না করে তিনি পৃথক একটি মৌলিক রাস্তা বেছে নেন।

ডায়াবেটিক্স এবং ফুড এন্ড নিউট্রিশনের যাত্রা শুরু

বিদ্যাসাগর ইউনিভার্সিটি থেকে ডায়াবেটিক্স এবং ফুড এন্ড নিউট্রিশন নিয়ে সাফল্যের সাথে মাস্টার ডিগ্রি পাশ করেন, এর পাশাপাশি তিনি ডিপ্লোমা করেন ইলেকট্রিকাল ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে বেলুড় মঠ থেকে। অবশেষে তিনি তার মনের মতো পথ খুঁজে পান, ডায়াটেটিক্স নিয়ে মাস্টার ডিগ্রিতে অত্যন্ত ভালো ফল করার পরে তিনি এটাকেই পেশা হিসেবে এগিয়ে নিয়ে যাবার সিদ্ধান্ত নেন। তার পরবর্তী পদক্ষেপ ছিল অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অফ হাইজিন এন্ড পাবলিক হেলথ থেকে ডিপ ডায়েট বা ডিপ্লোমা ইন ডায়াথেটিক্স। এখানেও তিনি হাই ফার্স্ট ডিভিশন স্কোর করেন, এবং স্থির হয় তিনি প্রফেশনাল ডায়েটিশিয়ান হিসেবেই এগোবেন।

কর্মক্ষেত্রের সূচনা

স্বনামধন্য ডায়েটিশিয়ান অরিজিৎ দে

রেজাল্ট তখন বেরোয়নি, তবে ইতিমধ্যেই তিনি জয়েন করেন যাদবপুরের একটি নামকরা পলিক্লিনিকে একজন কনসালট্যান্ট ডায়েটিশিয়ান এবং নিউট্রিশনিস্ট হিসেবে। তবে চিরকালই অরিজিতের কাছে জীবনের প্যাশন প্রাধান্য পেয়েছে তার ক্যারিয়ারের থেকেও অনেকাংশে বেশি, জীবনের প্রথম চাকরিতে তিনি সেদিনই ইস্তফা দিয়েছিলেন যেদিন সেই চাকরি তার জীবনের প্রিয় আইডল সৌরভ গাঙ্গুলির খেলা দেখতে যাবার পথে এসে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। কিন্তু জানলে অবাক হবেন এরপর থেকে তার শিক্ষা জগৎ এবং কর্মজগৎ আরো ব্যাপ্তি লাভ করে। SSKM থেকে ৬ মাসের ইন্টার্নশীপ করেন এবং কলকাতার বিভিন্ন নামি হাসপাতাল ও নার্সিংহোমে ফুলটাইমার এবং পারটাইমার হিসেবে দক্ষতার সঙ্গে কাজ করতে থাকেন। এইভাবে চলতে চলতে প্রথম একটি কলকাতার বড় হাসপাতালে ২০০৯ সালে ফুলটাইম সিনিয়র ডায়েটিশিয়ান,ডায়াবেটিক এডুকেটর এবং কনসালট্যান্ট নিউট্রিশনিস্ট হিসেবে তিনি যুক্ত হন এবং তার প্যাশন পূর্তি ঘটে।

অরিজিতের সেই স্বপ্নের গাড়ি

তার জীবনের অন্যতম একটি স্বপ্ন ছিল নিজের একটি বড় গাড়ি, সেটিও তিনি করে ফেলেন চাকরির প্রথম দিনেই। চাকরির প্রথম দিনেই তিনি তার স্বপ্নের গাড়িটি বুকিং করেন। এবারে তার কর্মক্ষেত্রে তিনি বহু ডাক্তারের সংস্পর্শে আসেন এবং তাদের সঙ্গে থেকে তিনি নানাবিধ শিক্ষালাভও করেন।

জীবনের নতুন অধ্যায়ের শুরু

২০১৪ সালে অরিজিৎ এবং সায়ন্তনীর বিয়ের ছবি

নিজেকে কর্মক্ষেত্রে সম্পূর্ণভাবে প্রতিষ্ঠিত করার পরে তিনি বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন, ২০১৪ সালে চাকরিসূত্রে শিক্ষয়িত্রী এবং কসমেটোলজি রিসার্চার সায়ন্তনীকে তিনি জীবনসঙ্গিনী হিসেবে খুঁজে নেন। ২০১৮ সালে তাদের কোল আলো করে আসে তাদের দেবাংশী কন্যা আরিয়ানা দে। বর্তমানে তার বয়স দুবছর, আজ যে মেয়ের কথা অরিজিৎ এক স্বাভাবিক পিতার মতোই বলেন কিন্তু তার পিছনে রয়েছে অনেক যুদ্ধের ইতিহাস।

ছোট্ট সোনা আরিয়ানার বাবা অরিজিৎ

২০১৮ সালে জন্ম নেবার পর ২০১৯ সালে মার্চ মাসের মধ্যে তার জীবনে নেমে আসে এক ঘন অন্ধকার। ছোট্ট আরিয়ানা তখন মাত্র ৫ মাসের, আক্রান্ত হয় একিউট লিভার ডিসফাংকশনে , বায়াপ্সি রিপোর্ট বলে ৯৮% লিভার তার অকেজো। পরিবারের সকলের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে, কলকাতায় তার চিকিৎসা অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। রোগ ধরা পড়ার ৩দিনের মধ্যেই চিকিৎসকেরা আশা ছেড়ে দেন, কিন্তু প্রথম থেকে অরিজিৎ শক্ত হাতে নিয়ন্ত্রণে রেখেছিলেন মেয়ের চিকিৎসা, সেই কারণে কলকাতার চিকিৎসা শাস্ত্রের অপারোগতায় মোটেও দোমে না গিয়ে ১০০% রিস্ক নিয়ে তিনি ও তার পরিবার মেয়েকে নিয়ে উড়ে যান দিল্লি।

মাত্র ৪৮ ঘন্টার ব্যবধানে লিভার ট্রান্সপ্লান্টের মতো বড় সিদ্ধান্ত নেন, ৭ই মার্চ ২০১৯ সালে মায়ের লিভারের অংশ নিয়ে লিভার প্রতিস্থাপন করা হয় আরিয়ানার দেহে। টানা দেড় মাস দিল্লিতে কাটান তারা, জন্মের কিছুকালের মধ্যে আরিয়ানাও হয়ে ওঠে খেতাবি। সব থেকে খুঁদে লিভার ট্রান্সপ্লান্টের মানুষ হিসেবে অরিজিতের মেয়ে আরিয়ানার নাম ‘The youngest liver transplant baby’ গুগলে পরিচিত।

আরও পড়ুন-কিটো ডায়েট সম্পর্কে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ উত্তর দিয়েছেন বিশিষ্ট ডায়েটিশিয়ান অরিজিৎ দে(Prominent dietitian Arijit Dey has given some important answers about the Keto diet)

জীবনের স্বাভাবিক ছন্দে ফিরে আসেন

মোহনবাগানী রঙের অরিজিতের বাড়ি

তবে এখানেই শেষ নয় জীবনের এই কঠিন পরিস্থিতির মোকাবিলা করে এক লাফে তিনি ফিরে আসেন জীবনের স্বাভাবিক ছন্দে। মোহনবাগান মাঠে সৌজন্যমূলক ম্যাচে অংশগ্রহণ করা থেকে শুরু করে, নিজের বাড়িকে মোহনবাগান রঙে রাঙিয়ে তোলা এই সব কিছুতেই অরিজিৎ তার প্যাশন কৃতির পরিচয় দিয়েছেন। শুধু তাই নয় প্রায়শঃই বিভিন্ন দৈনিক সংবাদপত্রে তার লিখিত ডায়েট বিষয়ক আর্টিকেলগুলি প্রকাশিত হতেই থাকে।

তিনি মনে করেন তার এই কৃতির উৎস হলেন স্বয়ং তার আরাধিতা মা কালী, যাকে তিনি বাড়িতে পুজো করেন অন্নকূট সহযোগে। উত্তরপাড়ায় ব্যানার্জি পাড়াতে তার উদ্যোগে নব উদ্যোমে শুরু হয় বারো হাত কালী পুজো।

অরিজিতের বাড়ির মা কালী পুজো

২০২০ সালের শুরু

এরপর উপস্থিত হয় ২০২০ সাল, অতিমারীরই ভয়াবহতায় যখন সকলেই জরাজীর্ণ এবং আতঙ্কিত এইসময়ও তিনি নিজেকে লক্ষ্যে স্থির রেখেছেন, তার একমাত্র কন্যাকে সুরক্ষিত রাখতে এবং হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অসহযোগিতার মাত্রাতে ইতি টানতে তিনি তার ১৩ বছরের পুরোনো কর্মক্ষেত্রকে ছাড়তে দ্বিধা করেননি। এরপর শুরু হয় তার নতুন যাত্রা, এতদিনের কর্মকান্ডে পেশেন্টদের সংখ্যা গিয়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫০০-৬০০ জন, বেশি ভাগ পেশেন্টদের সঙ্গে তার সম্পর্ক প্রায় আত্মীয়তার পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। তাঁদেরই অনুরোধে অরিজিৎ শুরু করেন অনলাইন কন্সালটেশন।

ফলস্বরূপ এবার শুধু রাজ্য বা দেশের মধ্যে নয় তার জন্যে রেফারেন্স আসতে থাকে গোটা বিশ্ব থেকে। বর্তমানে একজন অন্যতম ব্যস্ত কন্সাল্ট্যাটেন্ট তিনি এভাবেই নিজের জীবনের উদাহরণ দিয়ে থেমে না যাওয়ার মন্ত্র দেন তার পেশেন্টদের।

বর্তমানে Spark.Live এর এক অন্যতম বিশেষজ্ঞ অরিজিৎ দে

অনলাইন কন্সালটেশনের মাধ্যম হিসাবে তিনি বেছে নিয়েছেন Spark.Live কে, তিনি তার এত বছরের অভিজ্ঞতাকে কেন্ত্র করে অপূর্ব সুন্দরভাবে অনলাইন কন্সালটেশন করে চলেছেন। শতাধিক ক্লাইন্টকে তিনি তার ডায়েট চার্টের মাধ্যমে সুস্থতার দিশা দেখিয়ে চলেছেন। আমরা খুবই কৃতজ্ঞ তার কাছে, তিনি এভাবে সাবলীলভাবে অনলাইন ডায়েট কন্সালটেশন করে চলেছেন যার দ্বারা বহু মানুষেরা নিজেদের বাড়িতে বসেই খুবই কম খরচে নিজেদের ডায়েটের সমস্তরকম সমস্যার সমাধান করে নিতে পারছেন।

তাঁর মূল উদ্দেশ্য হল- সঠিক ডায়েটের মাধ্যমে মানুষকে সুস্থ্য জীবন দেওয়া। আশা করি আগামী দিনে অরিজিৎ আরও অনেক এগিয়ে যাবেন তাঁর কর্মক্ষেত্রে এবং নিজের পরিবার এবং একমাত্র কন্যাকে নিয়ে আনন্দে জীবনযাপন করবেন। Spark.Live এর পক্ষ থেকে রইলো অনেক শুভ কামনা।

Spark.Live এ থেরাপিউটিক ও ওয়েট ম্যানেজমেন্ট ডায়েট বিশেষজ্ঞ অরিজিৎ দের সঙ্গে অনলাইন কন্সালটেশনের জন্যে লিংকটিতে ক্লিক করুন-https://spark.live/consult/keto-diet-advice-for-weight-management-by-arijit-dey-bangla

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।